দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৯৯২ সালে মাস্ট্রিচ চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নামে একটি জোট তৈরি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য সংখ্যা মোট ২৭ টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশ গুলো সেই চুক্তির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিভাবে কাজ করে এবং কোন চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এতদূর এগিয়ে নিয়েছে তা জানার কৌতুহল নিশ্চয় আপনার রয়েছে। এই ব্লগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) হলো ইউরোপ মহাদেশের একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক বাজার এবং বিশ্ব রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইইউ এর লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক একীকরণ, রাজনৈতিক সহযোগিতা এবং নাগরিকদের জন্য উচ্চমানের জীবন নিশ্চিত করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের ইতিহাস
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল ভিত্তি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৫১ সালে ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায়ের (European Coal and Steel Community) গঠনের মধ্য দিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে রোম চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (European Economic Community) গঠিত হয়। ১৯৯২ সালে মাস্ট্রিচ চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) লক্ষ্য খুবই ব্যাপক এবং গভীর। মূলত, ইইউ-এর উদ্দেশ্য হল ইউরোপের দেশগুলোকে একত্রিত করে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধিশালী এবং একীভূত ইউরোপ গড়ে তোলা।
ইইউ-এর কিছু প্রধান লক্ষ্য হল:
১. শান্তি প্রতিষ্ঠা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি এড়াতে এবং স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করার জন্য ইইউ গঠিত হয়।
২. অর্থনৈতিক একীকরণ: ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য এবং মুক্ত চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
৩. রাজনৈতিক সহযোগিতা: বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে একটি মজবুত রাজনৈতিক ইউরোপ গড়ে তোলা।
৪. মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র: সকল নাগরিকের জন্য মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং তা সমাজে প্রচার করা।
৫. সামাজিক ন্যায়: সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
৬. পরিবেশ সুরক্ষা: পরিবেশের সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একত্রে লড়াই করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা কত?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য দেশ মোট ২৭ টি। যুক্তরাজ্য ২০২০ সালে ইইউ ত্যাগ করে, যা “ব্রেক্সিট” নামে পরিচিত। নিচে ইইউ-ভুক্ত দেশগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:
- অস্ট্রিয়া
- বেলজিয়াম
- বুলগেরিয়া
- ক্রোয়েশিয়া
- সাইপ্রাস
- চেক প্রজাতন্ত্র
- ডেনমার্ক
- এস্তোনিয়া
- ফিনল্যান্ড
- ফ্রান্স
- জার্মানি
- গ্রীস
- হাঙ্গেরি
- আয়ারল্যান্ড
- ইতালি
- লাটভিয়া
- লিথুয়ানিয়া
- লুক্সেমবার্গ
- মাল্টা
- নেদারল্যান্ডস
- পোল্যান্ড
- পর্তুগাল
- রোমানিয়া
- স্লোভাকিয়া
- স্লোভেনিয়া
- স্পেন
- সুইডেন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর কোথায়?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদর দপ্তর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অবস্থিত। ব্রাসেলস শহরকে ইউরোপের রাজধানীও বলা হয় কারণ এখানে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দপ্তর রয়েছে। ইইউ ছাড়াও, উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা (NATO) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাও ব্রাসেলসেই অবস্থিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বশেষ সদস্য দেশ কোনটি?
ক্রোয়েশিয়া হল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বশেষ সদস্য দেশ। ২০১৩ সালের ১ জুলাই ক্রোয়েশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশের সংখ্যা ২৭টি। ক্রোয়েশিয়া ২০০৭ সাল থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের জন্য আবেদন করেছিল। নানাবিধ জটিলতায় দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০১৩ সালে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুদ্রার নাম কি?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অধিকাংশ দেশের একক মুদ্রার নাম হল ইউরো। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সকল সদস্য দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ, তবুও সকল দেশেরই মুদ্রা ইউরো নয়। কিছু দেশ এখনও নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেসব দেশ যারা ইউরোকে তাদের একক মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদেরকে একসাথে ইউরোজোন বলা হয়। ইউরো একক মুদ্রা হিসেবে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও ব্যবসা বাড়াতে সাহায্য করেছে এবং অর্থনৈতিক একীকরণকে শক্তিশালী করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোথায় অবস্থিত?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যাকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (European Central Bank বা ECB) বলা হয়, তার সদর দপ্তর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে অবস্থিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জার্মানি ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিবেচিত ছিল। ফলে, ইউরোপের মুদ্রা নীতির কেন্দ্র হিসেবে জার্মানিকে যুক্তিযুক্ত বলে পছন্দ করা হয়।
শেষ কথা:
ইউরোপীয় ইউনিয়ন আধুনিক সময়ের এক অসাধারণ উদাহরণ যেখানে ২৭ টি দেশ একত্রে মিলে কাজ করে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও ইইউ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, তবুও এটি বৈশ্বিক সহযোগিতার এক সফল মডেল।
