ট্যুরিজম

সৌদি আরবের বিমান বন্দর কয়টি ও কি কি?

সৌদি আরবের বিমান বন্দর কয়টি ও কি কি
Written by eProbash

সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো উন্নত যাত্রীসেবা এবং কৌশলগত অবস্থানের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই দেশটিতে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর রয়েছে যা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় প্রকার যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ধনী রাস্ট্র সৌদি আরব। ৮,৩০,০০০ বর্গ মাইল আয়তনের এই দেশটিতে প্রায় ৩ কোটি ২৬ লক্ষ মানুষ বসবাস করে। এরই মধ্যে ৪২ শতাংশই প্রবাসী। সৌদি আরবে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র তথা মক্কা ও মদিনা থাকার কারণে বিশ্ব মুসলমানেরা হজ্ব, ওমরা এবং ইসলামি বিভিন্ন বিষয় দর্শনে সৌদিতে ছুটে যায়।

আন্তর্জাতিক ভাবেও সৌদিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করে থাকেন। আর এই ভ্রমণের সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যমটিই হলো বিমান বা আকাশপথ। একারণেই সৌদি আরবের বিমান বন্দর সম্পর্কে আপনার জানা জরুরি।

সৌদি আরবের বিমান বন্দর কয়টি ও কি কি?

সৌদি আরবে মোট ২৭টি বিমানবন্দর রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ৫টি আঞ্চলিক বিমানবন্দর এবং ১৬টি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দরগুলো হজ ও ওমরাহ পালনকারী মুসলিমদের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (International Airports)

সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত যাত্রীদের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। নিচে সৌদির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (King Khalid International Airport – RUH):

কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (King Khalid International Airport – RUH) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। ১৯৮৩ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দরে ৫টি যাত্রী টার্মিনাল রয়েছে এবং প্রতিটিতে ৮টি করে অ্যারো-ব্রিজ বিদ্যমান।

এছাড়াও, এখানে একটি রাজকীয় টার্মিনাল, একটি বিশাল মসজিদ এবং ১১,৬০০টি গাড়ির জন্য পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। বিমানবন্দরটি বছরে প্রায় ৩ কোটিরও বেশি যাত্রী এবং ২ লক্ষের বেশি বিমান চলাচল সামাল দিতে সক্ষম। আধুনিক স্থাপত্য এবং উন্নত যাত্রীসেবার জন্য এই বিমানবন্দরটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

২. কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (King Abdulaziz International Airport – JED):

কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (King Abdulaziz International Airport – JED) সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত একটি প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এটি দেশের ব্যস্ততম এবং আয়তনের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর। ১৯৮১ সালে এটি উদ্বোধন করা হয় এবং সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে।

এই বিমানবন্দরটি মূলত হজ ও ওমরাহ পালনকারী মুসলিমদের জন্য প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। এখানে একটি বিশেষ হজ টার্মিনাল রয়েছে যা একসঙ্গে ৮০,০০০ যাত্রী ধারণ করতে সক্ষম। এছাড়াও, এখানে উত্তর ও দক্ষিণ নামে আরও দুটি টার্মিনাল রয়েছে যা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনা করে। আধুনিক সব সুবিধা যেমন – শপিং মল, রেস্তোরাঁ, লাউঞ্জ, মুদ্রা বিনিময় এবং পরিবহন ব্যবস্থা এখানে বিদ্যমান। বিমানবন্দরটি জেদ্দা শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।

৩. কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (King Fahd International Airport – DMM):

কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (King Fahd International Airport – DMM) সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের রাজধানী দাম্মামে অবস্থিত। এটি আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবন্দর, যার আয়তন প্রায় ৭৭৬ বর্গ কিলোমিটার। তবে, এর টার্মিনাল এলাকা ৩২৭,০০০ বর্গমিটার।

১৯৯৯ সালে এটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে এবং কিং ফাহদ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের নামে নামকরণ করা হয়। বিমানবন্দরটিতে একটি প্রধান যাত্রী টার্মিনাল, একটি আরামকো টার্মিনাল (সৌদি আরামকোর কর্মীদের জন্য) এবং একটি রাজকীয় টার্মিনাল রয়েছে। দুটি সমান্তরাল রানওয়ে রয়েছে, প্রত্যেকটি ৪,০০০ মিটার দীর্ঘ।

কিং ফাহাদ বিমানবন্দর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যেমন ডিউটি-ফ্রি শপ, রেস্তোরাঁ, লাউঞ্জ, ব্যাংক এবং কারেন্সি এক্সচেঞ্জ সহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান করে। এটি বার্ষিক প্রায় ১০ মিলিয়নেরও বেশি যাত্রী পরিবহন করে এবং পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।

৪. প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Prince Mohammad Bin Abdulaziz International Airport – MED):

প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Prince Mohammad Bin Abdulaziz International Airport – MED) মদিনা শহরের ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। এটি মদিনা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রধান বিমানবন্দর হিসেবে কাজ করে। মূলত হজ ও ওমরাহ পালনকারী মুসলিমদের জন্য এই বিমানবন্দরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মদিনায় অবস্থিত ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান মসজিদে নববীতে প্রবেশের প্রধান পথ এটি।

১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিমানবন্দরটি domestic এবং Cairo, Dubai, Istanbul ও Kuwait City-এর মতো আঞ্চলিক গন্তব্যে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই বিমানবন্দরে রয়েছে প্রশস্ত টার্মিনাল, আগমন ও বহির্গমন লাউঞ্জ, শপিং মল, রেস্তোরাঁ এবং মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র। এছাড়াও, এখানে হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং পরিষেবা প্রদান করা হয়। বিমানবন্দরটি শহরের সাথে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে সংযুক্ত, যা যাত্রী এবং দর্শনার্থীদের জন্য যাতায়াতকে সহজ করে তোলে।

৫. তাইফ আঞ্চলিক বিমানবন্দর (Ta’if Regional Airport – TIF):

সৌদি আরবের মক্কা প্রদেশের তাইফ শহরের পূর্বে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে তাইফ আঞ্চলিক বিমানবন্দর (Ta’if Regional Airport – TIF) অবস্থিত। পূর্বে এটি একটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর থাকলেও, জেদ্দা, মদিনা ও রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর ওপর চাপ কমাতে ২০০৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পায়।

বর্তমানে এই বিমানবন্দরে একটি টার্মিনাল রয়েছে যার যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজার। এখানে বিশ্রাম ও খাবারের জন্য ছোট লাউঞ্জ এবং দুটি অ্যাসফাল্ট রানওয়ে (৩৭৩৫ মিটার ও ৩৩৫৫ মিটার দীর্ঘ) বিদ্যমান। মক্কা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায়, এটি হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়। বিমানবন্দরটি তাইফ এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পর্যটন ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

৬. ইয়ানবু প্রিন্স আব্দুল মোহসিন বিন আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Yanbu Prince Abdul Mohsin Bin Abdulaziz International Airport – YNB):

ইয়ানবু প্রিন্স আব্দুল মোহসিন বিন আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (YNB) সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে, মদিনা প্রদেশের ইয়ানবু শহরের কাছে অবস্থিত একটি সরকারি বিমানবন্দর। পূর্বে এটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত থাকলেও, ২০০৯ সালে এর আধুনিকায়ন করা হয় এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য উপযুক্ত করে তোলা হয়।

এই বিমানবন্দরে একটি প্রধান টার্মিনাল ভবন রয়েছে যা আগমন ও বহির্গমন লাউঞ্জ, শপিং এলাকা, ক্যাফে এবং অন্যান্য যাত্রী সুবিধা যেমন এটিএম, মুদ্রা বিনিময় এবং কার ভাড়া পরিষেবা প্রদান করে। এখানে দুটি এয়ার ব্রিজ রয়েছে, যা সৌদি আরবের আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে প্রথম। বিমানবন্দরটি প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৫০০ জন যাত্রী ধারণ করতে সক্ষম।

সৌদি আরবের আঞ্চলিক বিমানবন্দর (Regional Airports)

সৌদি আরবের আঞ্চলিক ৬ টি বিমানবন্দর সাধারণত দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে সংযোগ স্থাপন করে। বিমান বন্দরগুলো হলো: –

  • আবহা বিমানবন্দর (Abha Airport – AHB)
  • আল বাহা বিমানবন্দর (Al Baha Airport – ABT)
  • আল আহসা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Al-Ahsa International Airport – HOV)
  • গাসিম আঞ্চলিক বিমানবন্দর (Gassim Regional Airport – ELQ)
  • হায়িল আঞ্চলিক বিমানবন্দর (Hail Regional Airport – HAS)
  • অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর (Domestic Airports)

অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর (Domestic Airports)

সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ১৬ টি বিমানবন্দর মূলত দেশের বিভিন্ন শহরের মধ্যে বিমান যোগাযোগ স্থাপন করে এবং স্থানীয় যাত্রীদের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবন্দর গুলো হলো: –

  • আল জাওফ বিমানবন্দর (Al Jouf Airport – AJF)
  • আল কুরায়াত বিমানবন্দর (Al Qurayyat Airport – AQX)
  • আরার বিমানবন্দর (Arar Airport – RAE)
  • বাদানা বিমানবন্দর (Badanah Airport – XAO)
  • বিশা বিমানবন্দর (Bisha Airport – BHH)
  • দাওয়াদমি বিমানবন্দর (Dawadmi Airport – DWD)
  • গালফ মেডিকেল কমপ্লেক্স হেলিপোর্ট (Gulf Medical Complex Heliport – )
  • গুরুয়াত বিমানবন্দর (Gurayat Airport – GRT)
  • হাফার আল বাতেন বিমানবন্দর (Hafar Al-Batin Airport – AQI)
  • খামিস মুশাইত বিমানবন্দর (Khamis Mushait Airport – KMX)
  • নাজরান বিমানবন্দর (Najran Airport – NJN)
  • কাইসুমা বিমানবন্দর (Qaisumah Airport – AQM)
  • রাফহা বিমানবন্দর (Rafha Airport – RAH)
  • শারোরাহ বিমানবন্দর (Sharurah Airport – SHW)
  • সুলতান বিন আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর (Sultan Bin Abdulaziz Airport – TUU)
  • ওয়াদি আল দাওয়াসির বিমানবন্দর (Wadi al-Dawasir Airport – WAS)

সৌদি আরবের এই বিমানবন্দরগুলো দেশের অর্থনীতি, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং উন্নত যাত্রীসেবার মাধ্যমে এই বিমানবন্দরগুলো সৌদি আরবকে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

About the author

eProbash

প্রবাসীদের প্রতি অকৃত্রিম হৃদয়ের টান, তাদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রেখে তাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে গর্ববোধ করি।

Leave a Comment