মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এক ঝলমলে নক্ষত্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)। বালির সোনালী বিস্তৃতির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা অত্যাধুনিক স্থাপত্য, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অসাধারণ মিশ্রণ। সাতটি স্বাধীন রাস্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত আরব আমিরাত যেন এক স্বপ্নরাজ্য, যেখানে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আজও সগৌরবে টিকে আছে, অথচ ভবিষ্যতের দিকে তার দৃষ্টি সর্বদা প্রসারিত।
আবু ধাবির ক্ষমতাশালী রাজধানী থেকে দুবাইয়ের ঝলমলে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, শারজাহর শিল্প ও সংস্কৃতির ভান্ডার থেকে আজমানের শান্ত স্নিগ্ধতা, ফুজাইরাহর মনোরম সৈকত থেকে রাস আল খাইমাহর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং উম্ম আল কোয়াইনের নীরব সৌন্দর্য, প্রতিটি আমিরাতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ।
তেলের প্রাচুর্যে ভরপুর এই দেশটি খুব অল্প সময়ে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। আকাশ ছোঁয়া বুর্জ খলিফা থেকে শুরু করে পাম জুমেইরার কৃত্রিম দ্বীপ, মরুভূমির রোমাঞ্চকর সাফারি ইত্যাদি সবই যেনো সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিশ্বের কাছে অন্যভাবে প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের অগণিত মানুষ এই আরব আমিরাতে রেমিট্যোন্স যোদ্ধা হিসেবে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। ভ্রমণের জন্যও আরব আমিরাত (United Arab Emirates) খুবই উপযোগী। আজ আমরা এই দেশটি সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানার চেষ্টা করবো।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট আয়তন কত?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট আয়তন প্রায় ৮৩,৬০০ বর্গকিলোমিটার (৩২,৩০০ বর্গমাইল)। এই আয়তন দেশটির সাতটি আমিরাত – আবু ধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, ফুজাইরাহ, রাস আল খাইমাহ এবং উম্ম আল কোয়াইন – কে অন্তর্ভুক্ত করে। ভৌগোলিকভাবে, দেশটির বেশিরভাগ অংশ মরুভূমি দ্বারা গঠিত।
সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়টি দেশ নিয়ে গঠিত?
সংযুক্ত আরব আমিরাত সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি ফেডারেশন। এই সাতটি রাষ্ট্রকে আমিরাত বলা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দেশ সমূহ হলো:
- ১. আবু ধাবি
- ২. দুবাই
- ৩. শারজাহ
- ৪. আজমান
- ৫. ফুজাইরাহ
- ৬. রাস আল খাইমাহ
- ৭. উম্ম আল কোয়াইন
এই সাতটি আমিরাত ১৯৭১ সালে একত্রিত হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠন করে। প্রতিটি আমিরাতের নিজস্ব শাসক (আমির) রয়েছে, তবে তারা একটি ফেডারেল সরকারের অধীনে ঐক্যবদ্ধ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যা কত?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যা বর্তমানে (২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী) প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ। তবে বিভিন্ন সূত্র এই সংখ্যায় সামান্য ভিন্নতা দেখায়:
- ওয়ার্ল্ডোমিটার: ২০২৫ সালের ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত আনুমানিক জনসংখ্যা ১ কোটি ১০ লক্ষ ২৭ হাজার ১শ ২৯ জন। তারা ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে জনসংখ্যা ১ কোটি ১৩ লক্ষ ৪৬ হাজার হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
- গ্লোবাল মিডিয়া ইনসাইট: মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত জনসংখ্যা ১ কোটি ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার বলে উল্লেখ করেছে।
- কান্ট্রিমিটার্স: ২০২৫ সালের ৬ই এপ্রিল পর্যন্ত আনুমানিক জনসংখ্যা ১ কোটি ৮ লক্ষ ৫০ হাজার ১শ ৮৮ জন।
উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অভিবাসী ও প্রবাসী। ধারণা করা হয়, মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১-১৫% আমিরাতি নাগরিক, বাকিরা বিদেশী।
জনসংখ্যার দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৃহত্তম শহরগুলো হলো:
- দুবাই: ৩৮ লক্ষের বেশি
- আবু ধাবি: ৩৭ লক্ষের বেশি
- শারজাহ: প্রায় ১৮ লক্ষ
গত কয়েক দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অভিবাসন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় দিবস কখন?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রধান জাতীয় দিবস রয়েছে। যেটিকে National Day হিসেবে প্রতি বছর ২ ডিসেম্বর পালন করা হয়। এই দিনটি ১৯৭১ সালে ছয়টি আমিরাতের (আবু ধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, ফুজাইরাহ এবং উম্ম আল কোয়াইন) একত্র হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিনটিকে স্মরণ করে। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাস আল খাইমাহও এই ফেডারেশনে যোগদান করে।
জাতীয় দিবস সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উৎসবগুলির মধ্যে একটি। এই দিনটিতে দেশজুড়ে বিভিন্ন উৎসব, প্যারেড, কনসার্ট এবং আতশবাজির আয়োজন করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকে এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এই দিনটি আমিরাতের জনগণের ঐক্য ও জাতীয় গর্বের প্রতীক।
যদিও একটি প্রধান জাতীয় দিবস রয়েছে, ৩০শে নভেম্বর তারিখে Emirati Martyrs’ Day বা শহীদ দিবস পালন করা হয়। এটি জাতীয় দিবস নয়, তবে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্মরণীয় দিন। এই দিনে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের স্মরণ করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি কে?
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি হলেন শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তিনি ১৪ মে ২০২২ সালে এই পদে অধিষ্ঠিত হন। এর আগে তিনি দেশটির দীর্ঘদিনের ক্রাউন প্রিন্স এবং ডি-ফ্যাক্টো শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুদ্রার নাম কি?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুদ্রার নাম হলো Emirati Dirham, যা বাংলায় আমিরাতি দিরহাম নামে পরিচিত।
এর প্রতীক হলো AED, তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে Dh এবং Dhs-ও ব্যবহার করা হয়। দিরহাম ১০০ ফিলসে বিভক্ত। আরবিতে এর প্রতীক د.إ এবং লাতিন লিপিতে DH অথবা Dhs লেখা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ১ টাকা বাংলাদেশের কত টাকা?
বর্তমানে (৭ই এপ্রিল, ২০২৫ তারিখ অনুযায়ী) সংযুক্ত আরব আমিরাতের ১ দিরহাম (AED) প্রায় ৩৩.০৩ থেকে ৩৩.০৮ বাংলাদেশী টাকার (BDT) সমান।
তবে, মুদ্রার বিনিময় হার প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তাই এই মানটি সামান্য ওঠানামা করতে পারে। সবচেয়ে নির্ভুল তথ্য জানার জন্য, আপনি যেকোনো মুদ্রা বিনিময় ওয়েবসাইটে বা আপনার স্থানীয় ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করে আজকের দিনের সঠিক বিনিময় হার জেনে নিতে পারেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানীর নাম কি?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী হলো আবু ধাবি। এটি দেশটির বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ধনী আমিরাতগুলির মধ্যে অন্যতম। পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই শহরটি কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক কেন্দ্রই নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
আবু ধাবিতে ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর, রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ভবন অবস্থিত। আধুনিক স্থাপত্য, সুপ্রশস্ত রাস্তাঘাট এবং মনোরম সমুদ্র সৈকতের জন্য এই শহরটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তেল সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে আবু ধাবি দ্রুত একটি আধুনিক ও উন্নত শহরে রূপান্তরিত হয়েছে এবং বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও বিলাসবহুল শহর হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের নতুন প্রেসিডেন্ট কে?
সংযুক্ত আরব আমিরাত সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি ফেডারেশন। এখানে প্রতিটি দেশের জন্যই আলাদা আলাদা প্রেসিডেন্ট বা স্থানীয় সরকার আছে। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি হলেন শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
তিনি ১৪ মে ২০২২ সালে তার সৎ ভাই শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মৃত্যুর পর এই পদে নির্বাচিত হন। শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান দীর্ঘদিন ধরে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই, তিনি দেশটির “নতুন” রাষ্ট্রপতি নন, বরং ২০২২ সাল থেকে বর্তমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বাধীনতা দিবস
সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বাধীনতা অর্জনের দিনটি হলো ২ ডিসেম্বর, ১৯৭১। এই দিনটি দেশটির ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দীর্ঘকাল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার পর, আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ছয়টি স্বাধীন রাষ্ট্র – আবু ধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, উম্ম আল কোয়াইন এবং ফুজাইরাহ – একত্রিত হয়ে একটি নতুন ফেডারেল রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৭১ সালের এই দিনে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং “সংযুক্ত আরব আমিরাত” নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
পরবর্তীতে, ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সপ্তম আমিরাত রাস আল খাইমাহও এই নবগঠিত ফেডারেশনে যোগদান করে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বর্তমান কাঠামোকে পূর্ণতা দেয়। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে প্রতি বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় দিবস হিসেবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করা হয়।
দেশজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকে এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কুচকাওয়াজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে এই দিনটিকে স্মরণ করা হয়। এটি কেবল একটি স্বাধীনতা দিবসই নয়, বরং এই অঞ্চলের জনগণের ঐক্য, সংহতি ও জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
