ট্যুরিজম

এক নজরে মালয়েশিয়া দেশ (মালয়েশিয়া সম্পর্কে তথ্য)

এক নজরে মালয়েশিয়া দেশ (মালয়েশিয়া সম্পর্কে তথ্য)
Written by eProbash

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক মনোরম দেশ মালয়েশিয়া। বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মুখরোচক খাবারের এক অসাধারণ মিশ্রণ এই দেশটিকে পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলেছে। প্রবাসীদের কাছেও মালয়েশিয়া এক বিশেষ আকর্ষণ।

মালয়েশিয়ার ইতিহাসে বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব দেখা যায়। এর প্রতিফলন ঘটে দেশটির বিভিন্ন স্থাপত্যে। কুয়ালালামপুরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য যেমন মারদেকা স্কোয়ার বা সুলতান আব্দুল সামাদ বিল্ডিং ঔপনিবেশিক যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়। মালাক্কার ঐতিহাসিক শহর, যা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত, তার লাল রঙের ঔপনিবেশিক ভবন এবং সরু রাস্তাগুলো অতীত দিনের সাক্ষী।

জর্জ টাউনের রঙিন স্ট্রিট আর্ট এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্যও পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। আপনি একজন পর্যাটক বা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা যাই হোন না কেন, এই ব্লগ থেকে আপনি মালয়েশিয়া সম্পর্কে অনেক অজানা বিষয় জানতে পারবেন।

মালয়েশিয়া সম্পর্কে তথ্য

মালয়েশিয়া দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত – উপদ্বীপ মালয়েশিয়া (পশ্চিম মালয়েশিয়া) এবং বোর্নিও দ্বীপের অংশ (পূর্ব মালয়েশিয়া)। মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি বহুজাতির সংমিশ্রণে গঠিত। এখানে মালয়, চীনা, ভারতীয় এবং অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষ একসাথে বসবাস করে।

একসময় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থাকলেও বর্তমানে মালয়েশিয়া একটি দ্রুত উন্নয়নশীল শিল্পোন্নত দেশ। ইলেকট্রনিক্স, পেট্রোলিয়াম, পর্যটন এবং কৃষি এখানকার অর্থনীতির মূল ভিত্তি। মালয়েশিয়া বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে এক জনপ্রিয় গন্তব্য। মালয়েশিয়ার খাবার তার সংস্কৃতির মতোই বৈচিত্র্যপূর্ণ।

মালয়েশিয়া কত সালে স্বাধীন হয়?

মালয়েশিয়া ১৯৫৭ সালের ৩১শে আগস্ট ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এই দিনটি মালয়েশিয়ায় “Hari Merdeka” (স্বাধীনতা দিবস) নামে পরিচিত এবং প্রতি বছর জাতীয়ভাবে পালিত হয়।

মালয়েশিয়া কোন দেশের উপনিবেশ ছিল?

মালয়েশিয়া একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ১৮ শতকের শেষভাগ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অংশ শাসন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের দখলে থাকার পর, স্থানীয়দের স্বাধিকার আন্দোলনের ফলে ১৯৫৭ সালের ৩১শে আগস্ট মালয়েশিয়া স্বাধীনতা অর্জন করে।

মালয়েশিয়ার আয়তন কত?

মালয়েশিয়ার মোট আয়তন প্রায় ৩৩০,৮০৩ বর্গ কিলোমিটার (১২৭,৭২০ বর্গ মাইল)। এই আয়তনের মধ্যে উপদ্বীপ মালয়েশিয়া (পশ্চিম মালয়েশিয়া) প্রায় ১৩২,০৯০ বর্গ কিলোমিটার এবং বোর্নিও দ্বীপের অংশ (পূর্ব মালয়েশিয়া) প্রায় ১৯৮,৮৪৭ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। দেশটির স্থলভাগের পাশাপাশি কিছু জলভাগও এর অন্তর্ভুক্ত। এই আয়তন মালয়েশিয়াকে বিশ্বের ৬৭তম বৃহত্তম দেশে পরিণত করেছে।

মালয়েশিয়ার রাজধানীর নাম কি?

মালয়েশিয়ার রাজধানীর নাম কুয়ালালামপুর। এটি দেশটির বৃহত্তম শহর এবং একইসাথে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। আধুনিক স্থাপত্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায় এই শহরে। বিখ্যাত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার এখানেই অবস্থিত, যা একসময় বিশ্বের উচ্চতম ভবন ছিল।

মালয়েশিয়ার ভাষার নাম কি?

মালয়েশিয়ার সরকারি ভাষার নাম হলো মালয় ভাষা (Bahasa Melayu)। তবে এটিকে বাহাসা মালয়েশিয়া নামেও অভিহিত করা হয়। এই ভাষাটি মূলত মালয় উপদ্বীপ এবং এর আশেপাশে প্রচলিত একটি অস্ট্রোনেশীয় ভাষা। মালয়েশিয়ার সংবিধান অনুযায়ী এটি জাতীয় ভাষা এবং সরকারি কাজকর্ম, শিক্ষা ও গণমাধ্যমে এর ব্যবহার প্রধান। তবে দেশটিতে ইংরেজি এবং অন্যান্য চীনা ও ভারতীয় ভাষাও প্রচলিত রয়েছে।

মালয়েশিয়ার মুদ্রার নাম কি?

মালয়েশিয়ার মুদ্রার নাম হচ্ছে রিংগিত (Ringgit), যার আন্তর্জাতিক সংকেত MYR। এটি মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক Bank Negara Malaysia দ্বারা ইস্যু করা হয়। রিংগিত শব্দের অর্থ “ফাঁপা” বা “খাঁজকাটা”, যা পূর্বে ব্যবহৃত স্প্যানিশ মুদ্রা থেকে এসেছে। মালয়েশিয়ায় রিংগিতের পাশাপাশি কয়েনও প্রচলিত আছে, যেগুলো ‘সেন’ নামে পরিচিত।

মালয়েশিয়া বিভাগ কয়টি?

বর্তমানে মালয়েশিয়া ১৩টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত। এই রাজ্যগুলোকে সাধারণভাবে দুটি ভৌগোলিক বিভাগে ভাগ করা যায়:

১. উপদ্বীপ মালয়েশিয়া (Peninsular Malaysia): এটি মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণাংশে অবস্থিত এবং এখানে ১১টি রাজ্য ও ২টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (কুয়ালালামপুর ও পুত্রজায়া) রয়েছে। এই অংশে মালয়েশিয়ার জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাস করে এবং এর অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে উন্নত।

২. পূর্ব মালয়েশিয়া (East Malaysia): এটি বোর্নিও দ্বীপের উত্তরাংশে অবস্থিত এবং এখানে ২টি রাজ্য (সাবাহ ও সারাওয়াক) ও ১টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (লাবুয়ান) রয়েছে। পূর্ব মালয়েশিয়া তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, রেইনফরেস্ট এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত।

সুতরাং, প্রশাসনিকভাবে মালয়েশিয়া ১৩টি রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত হলেও, ভৌগোলিকভাবে এটিকে প্রধানত দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়।

মালয়েশিয়া কয়টি জেলা আছে?

মালয়েশিয়ায় মোট ১৩৭টি জেলা রয়েছে। এই জেলাগুলো দেশটির ১৩টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধীনে বিস্তৃত। উপদ্বীপ মালয়েশিয়া এবং বোর্নিও দ্বীপের পূর্ব মালয়েশিয়া উভয় অংশেই এই জেলাগুলো প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করে।

প্রতিটি জেলার নিজস্ব স্থানীয় সরকার এবং প্রশাসনিক কাঠামো বিদ্যমান। এই জেলাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সেবা প্রদান এবং সরকারি নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নাম কি?

মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নাম দত্ত শ্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি ২০২২ সালের ২৪শে নভেম্বর মালয়েশিয়ার দশম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার পিপলস জাস্টিস পার্টির (PKR) সভাপতি এবং একজন দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ। এর আগে তিনি বিরোধী দলের নেতা এবং উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

মালয়েশিয়ার জাতীয় মসজিদ

মালয়েশিয়ার জাতীয় মসজিদের নাম হলো মাসজিদ নেগারা (Masjid Negara)। এর অর্থ হলো “জাতীয় মসজিদ”। এটি কুয়ালালামপুরে অবস্থিত। মসজিদটি ১৯৬৩ সালে নির্মাণ করা শুরু হয়েছিল এবং ১৯৬৫ সালে এটি জনসাধারণের জন্য খোলা হয়।

মাসজিদ নেগারা মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা লাভের প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এর স্থাপত্যশৈলীতে আধুনিক নকশার সাথে ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক শিল্পের মিশ্রণ দেখা যায়। মসজিদটির প্রধান গম্বুজটি একটি ১৬-তারা বিশিষ্ট নকশায় তৈরি, যা মালয়েশিয়ার ১৩টি রাজ্য এবং ইসলামের ৫টি স্তম্ভকে নির্দেশ করে।

মালয়েশিয়ার জাতীয় খেলা কি?

মালয়েশিয়ার জাতীয় খেলা হলো সেপাক টাকরা (Sepak Takraw)। এটি “কিক ভলিবল” নামেও পরিচিত। বাঁশ বা বেতের তৈরি একটি ছোট বল ব্যবহার করে দুটি দলের মধ্যে খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। খেলোয়াড়রা হাত ব্যবহার করা ছাড়া পা, হাঁটু, বুক এবং মাথা দিয়ে বলটিকে নেটের ওপারে পাঠানোর চেষ্টা করে। দ্রুত গতি এবং কৌশলপূর্ণ অ্যাকশনের জন্য এই খেলাটি মালয়েশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মালয়েশিয়ার জাতীয় ফল কি?

মালয়েশিয়ার কোনো সরকারিভাবে জাতীয় ফল ঘোষণা করা হয়নি। তবে, দুটি ফলকে প্রায়শই জাতীয় ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়: পেঁপে এবং ডুরিয়ান। পেঁপে সারা বছর সহজলভ্য এবং এর পুষ্টিগুণ অনেক। অন্যদিকে, ডুরিয়ান তার তীব্র গন্ধ ও বিশেষ স্বাদের জন্য “ফলের রাজা” নামে পরিচিত এবং মালয়েশিয়ায় এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুলের নাম কি?

মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুলের নাম হিবিসকাস (Hibiscus rosa-sinensis), স্থানীয়ভাবে যেটিকে বলা হয় “বুঙ্গা রায়া”। এই ফুলটি বড়, উজ্জ্বল লাল রঙের এবং দেখতে খুবই আকর্ষণীয়। ১৯৬০ সালে এটি জাতীয় ফুল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি মালয়েশিয়ার ঐক্য, সাহস ও সৌন্দর্যের প্রতীক। স্কুল, সরকারি অফিস ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই ফুলের ব্যবহার প্রচলিত।

মালয়েশিয়ার জাতীয় পশুর নাম

মালয়েশিয়ার জাতীয় পশু হলো মালয়ী বাঘ (Panthera tigris jacksoni)। এটি বাঘের একটি উপ-প্রজাতি এবং শুধুমাত্র মালয় উপদ্বীপের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে এদের দেখা যায়। মালয়ী বাঘ শক্তি ও সাহসের প্রতীক হিসেবে দেশটির জাতীয় প্রতীক এবং সরকারি বিভিন্ন মনোগ্রামে ব্যবহৃত হয়।

মালয়েশিয়ার জাতীয় মাছের নাম কি?

মালয়েশিয়ার জাতীয় মাছের নাম হল কেলাহ (Kelah)। এটি ‘মাহসির’ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Tor tambroides। স্বাদু জলের এই মাছটি তার রূপালী আঁশ এবং চমৎকার স্বাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। কেলাহ সাধারণত পরিষ্কার জলের নদীতে বাস করে এবং এটি মালয়েশিয়ার স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছটি বেশ দামি এবং ধরাও বেশ কঠিন।

মালয়েশিয়ার জাতীয় পাখির নাম কি?

মালয়েশিয়ার জাতীয় পাখির নাম Rhinoceros Hornbill (বৈজ্ঞানিক নাম: Buceros rhinoceros)। এটি একটি বড় আকারের বনবাসী পাখি এবং এর ঠোঁটের উপরে একটি বিশিষ্ট শৃঙ্গের মতো কাঠামো রয়েছে, যা এটিকে সহজেই চেনা যায়। কালো ও সাদা পালক এবং উজ্জ্বল কমলা-লাল রঙের ঠোঁট এটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

শেষ কথা:

উপসংহারে বলা যায়, মালয়েশিয়া কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশই নয়, বরং এটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির এক চমৎকার মিলনস্থল। বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকৃতি, বহুসংস্কৃতির মেলবন্ধন, দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি এবং আধুনিক শহরের আকর্ষণ, এই সবকিছু মিলিয়ে মালয়েশিয়াকে অনন্য বলা যায়। পর্যাটক এবং প্রবাসীদের কাছেও মালয়েশিয়া খুবই পছন্দের একটি জায়গা।

About the author

eProbash

প্রবাসীদের প্রতি অকৃত্রিম হৃদয়ের টান, তাদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রেখে তাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে গর্ববোধ করি।

Leave a Comment