বিদেশ ভ্রমণ, উচ্চশিক্ষা, চাকরি বা নতুন কোনো ব্যবসা শুরুর স্বপ্ন, এই সবকিছুর জন্য একটি সাধারণ এবং অপরিহার্য নথি হলো ভিসা (Visa)। ভিসা হলো একটি দেশের সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এমন এক আনুষ্ঠানিক অনুমতি, যা একজন বিদেশী নাগরিককে সেই দেশে নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য প্রবেশ ও থাকার অধিকার দেয়।
কিন্তু এই ভিসা এক প্রকারের নয়। আপনার ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং সময়কালের উপর নির্ভর করে এর প্রকারভেদ হয়। চলুন, ভিসার প্রধান প্রকারভেদ ও তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
ভিসা কত প্রকার ও কি কি?
প্রধানত ভিসাকে চারটি মৌলিক শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
১. অ-অভিবাসী ভিসা (Non-Immigrant Visa): এই ভিসার মাধ্যমে একজন বিদেশী নাগরিক একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই দেশে অবস্থান করতে পারে। এই ভিসার মেয়াদ শেষ হলে বা উদ্দেশ্য পূরণ হলে তাকে নিজ দেশে ফিরে যেতে হয়। বেশিরভাগ ভিসা এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।
২. অভিবাসী ভিসা (Immigrant Visa): এই ভিসার উদ্দেশ্য হলো অন্য দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা। এটি সাধারণত সেই দেশের স্থায়ী বাসিন্দা বা নাগরিকত্বের দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।
৩. কূটনৈতিক বা অফিসিয়াল ভিসা (Diplomatic or Official Visa): বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের জন্য এই ভিসা ইস্যু করা হয়। এটি সাধারণত “A” বা “G” ক্যাটাগরির হয়ে থাকে।
- আরো পড়ুন: সৌদি আরবের কোম্পানি ভিসা বেতন কত?
৪. ট্রানজিট ভিসা (Transit Visa): যখন কোনো যাত্রী এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে তৃতীয় কোনো দেশে অল্প সময়ের জন্য (সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা) বিরতি নেয় বা বিমান পরিবর্তন করে, তখন এই ভিসা প্রয়োজন হতে পারে।
উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে ভিসার বিস্তারিত প্রকারভেদ:
ভিসা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে জারি করা হয়, এবং প্রতিটি দেশের নামকরণ ও নিয়ম কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে প্রধান প্রকারগুলি নিম্নরূপ:
১. পর্যটন/ভিজিটর ভিসা (Tourist/Visitor Visa – B-2):
- উদ্দেশ্য: শুধুমাত্র অবকাশ যাপন, দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, বন্ধু বা আত্মীয়দের সাথে দেখা করা বা স্বল্প মেয়াদে চিকিৎসার জন্য এই ভিসা ব্যবহার করা হয়।
- বৈশিষ্ট্য: এই ভিসা দিয়ে সাধারণত কাজ বা পড়াশোনা করা যায় না।
২. ব্যবসায়িক ভিসা (Business Visa – B-1):
- উদ্দেশ্য: ব্যবসায়িক মিটিং, চুক্তি স্বাক্ষর, সম্মেলন বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়।
- বৈশিষ্ট্য: এই ভিসার মাধ্যমে ওই দেশে কোনো কাজ করে বেতন নেওয়া বা স্থায়ী ব্যবসা শুরু করা যায় না।
৩. ছাত্র ভিসা (Student Visa – F-1, M-1, J-1 ইত্যাদি):
- উদ্দেশ্য: কোনো স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা বা গবেষণার জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়।
- বৈশিষ্ট্য: এই ভিসার জন্য সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রমাণপত্র এবং পড়াশোনার খরচ বহন করার আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ দেখাতে হয়।
৪. কাজের ভিসা (Work/Employment Visa – H-1B, L, O, P ইত্যাদি):
- উদ্দেশ্য: বিদেশে গিয়ে কাজ করার জন্য বা কোনো নির্দিষ্ট চাকরিতে নিযুক্ত হওয়ার জন্য এই ভিসা লাগে।
- বৈশিষ্ট্য: সাধারণত একটি বিদেশী সংস্থা থেকে চাকরির অফার বা স্পন্সরশিপের প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন দক্ষতা, পেশা এবং স্থানান্তরের উপর ভিত্তি করে এর বিভিন্ন উপ-প্রকার রয়েছে।
- আরো পড়ুন: পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে দুবাই ভিসা চেক
৫. চিকিৎসা ভিসা (Medical Visa):
- উদ্দেশ্য: সুনির্দিষ্ট উন্নত চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য।
- বৈশিষ্ট্য: চিকিৎসার প্রমাণপত্র, আমন্ত্রণপত্র এবং আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রমাণ প্রয়োজন হয়।
৬. পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা (Family Reunion Visa):
- উদ্দেশ্য: যে দেশে পরিবারের কোনো সদস্য (স্বামী/স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা) স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বা নাগরিক, তাদের সঙ্গে বসবাসের জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়।
ভিসা প্রদানের পদ্ধতির ভিত্তিতে প্রকারভেদ:
ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়া অনুসারেও কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- স্টিকার ভিসা (Sticker Visa): পাসপোর্টের একটি পাতায় স্টিকার বা সিল আকারে ভিসা প্রদান করা হয়। এটি সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি।
- ই-ভিসা বা অনলাইন ভিসা (E-Visa/Online Visa): অনলাইনে আবেদন করার পর ভিসা একটি ডিজিটাল ডকুমেন্ট আকারে দেওয়া হয়, যা প্রিন্ট করে পাসপোর্টের সাথে বহন করতে হয়।
- অন-অ্যারাইভাল ভিসা (Visa On Arrival – VOA): এই ক্ষেত্রে ভ্রমণের আগে ভিসা লাগে না। গন্তব্য দেশের বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ভিসা ইস্যু করা হয়।
- ভিসা-মুক্ত প্রবেশ (Visa-Free Entry): কিছু কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দেশে ভিসা ছাড়াই স্বল্প সময়ের জন্য ভ্রমণের অনুমতি থাকে।
উপসংহার:
ভিসা হলো একটি আইনি প্রক্রিয়া, যা প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময়, আপনার উদ্দেশ্য অনুযায়ী সঠিক ভিসার প্রকারটি বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি দেশের ভিসা প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে, তাই ভ্রমণের আগে সেই দেশের দূতাবাস বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট
