eProbash

হুন্ডি কি বা হুন্ডি কাকে বলে? (আদ্যোপান্ত জানুন)

হুন্ডি কি বা হুন্ডি কাকে বলে
Written by eProbash

বিদেশ থেকে দেশে টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলের বাহিরে একটি পদ্ধতি রয়েছে, তা হলো হুন্ডি। প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অনেকেই হুন্ডি ব্যবহার করে নিজ পরিবারের কাছে টাকা পাঠান। অনেকেই মনে করেন এটি ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে সহজলভ্য এবং দ্রুত টাকা পাঠানোর সেরা মাধ্যম। কিন্তু আপনি জানেন হুন্ডি কি বা হুন্ডি কাকে বলে, আর এটি কতটা নিরাপদ এবং এই প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের আইনে বৈধ কিনা।

শুরুতেই বলে নিই, হুন্ডি হলো একটি নীতি বহির্ভূত এবং দেশের আইন দ্বারা নিষিদ্ধ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ হস্তান্তর বা স্থানান্তর ব্যবস্থা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে কোনো বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পাঠানো বা লেনদেন করার প্রক্রিয়া।

এই ব্লগ পোস্টে আমরা হুন্ডি বলতে কি বুঝায়, এর প্রকারভেদ, ব্যবহারের কারণ এবং এর অপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। পাশাপাশি, কেন এই প্রথা আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থায় একটি উদ্বেগের কারণ, তাও খতিয়ে দেখবো। প্রবাসী -প্রেরিত রেমিট্যান্স যখন হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসে তখন এর অসুবিধা গুলো কি, যা দেশের আইন দ্বারা নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয়।

হুন্ডি কি বা হুন্ডি কাকে বলে?

‘হুন্ডি’ (Hundi) শব্দটি মূলত সংস্কৃত শব্দ ‘হুন্ড’ (Hund) থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ হলো সংগ্রহ করা বা জমা করা। সাধারণভাবে, এটি এমন একটি দলিল বা প্রক্রিয়াকে বোঝায় যার মাধ্যমে অর্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরণ বা সংগ্রহ করা হয়। এটি Bill of Exchange বা বিনিময় বিল নামেও পরিচিত।

আর্থিক পরিভাষায়, হুন্ডি হলো একটি নীতি বহির্ভূত এবং দেশের আইন দ্বারা নিষিদ্ধ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ হস্তান্তর বা স্থানান্তর ব্যবস্থা। এটি একটি লিখিত শর্তহীন আদেশনামা যা মূলত মধ্যযুগীয় ভারতে বাণিজ্য ও ঋণ লেনদেনের জন্য উদ্ভূত হয়েছিল। এর মাধ্যমে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়, যা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে সম্পাদিত হয়।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী, হুন্ডি হলো “চেক নামযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের নিমিত্তে অন্যকে নির্দেশ করে লিখিত একটি শর্তহীন আদেশ”। এটিকে বাণিজ্যিক আদান প্রদান ও লেনদেনের অনানুষ্ঠানিক দলিল হিসেবেও গণ্য করা হয়। যদিও একসময় এটি বৈধ এবং নিরাপদ ছিল, বর্তমানে এর অবৈধ কার্যকলাপ এবং আর্থিক নীতিমালার বাইরে লেনদেন হওয়ার কারণে এটি একটি বিতর্কিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়।

হুন্ডি কিভাবে কাজ করে?

হুন্ডির কার্যপদ্ধতি একটি অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যেখানে কোনো নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সরাসরি তত্ত্বাবধান থাকে না। সাধারণত, প্রেরক (যিনি টাকা পাঠাতে চান) তার স্থানীয় একজন হুন্ডি ব্যবসায়ীর সাথে যোগাযোগ করেন। ব্যবসায়ী প্রেরকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেন এবং গন্তব্যের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট হারে সেই অর্থ প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এই লেনদেনে একটি অলিখিত বা মৌখিক চুক্তি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা তাদের সেবার জন্য একটি ছোট কমিশন নিয়ে থাকেন। এরপর, প্রেরকের স্থানীয় হুন্ডি ব্যবসায়ী গন্তব্যের কাছাকাছি বা সেই অঞ্চলের অন্য কোনো হুন্ডি ব্যবসায়ীর সাথে যোগাযোগ করেন। তারা একটি গোপন সংকেত বা তথ্যের মাধ্যমে লেনদেনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

যখন প্রাপক গন্তব্যের হুন্ডি ব্যবসায়ীর সাথে যোগাযোগ করেন এবং সেই গোপন সংকেত বা তথ্য প্রদান করেন, তখন ব্যবসায়ী প্রেরকের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের সমপরিমাণ অর্থ (কমিশন বাদ দিয়ে) প্রাপকের কাছে হস্তান্তর করেন।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র বা আইনি নথি তৈরি হয় না; এটি সম্পূর্ণরূপে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং একটি অলিখিত বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করে চলে। অর্থ স্থানান্তরের এই পদ্ধতিটি সাধারণত দ্রুত এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে সহজলভ্য হলেও, এটি সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেশের প্রচলিত আর্থিক আইনের পরিপন্থী।

হুন্ডি কেন অবৈধ?

হুন্ডি কেন অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয় কিভাবে তা যদি আপনি জানেন তবে ব্যাপারটি বুঝতে আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে। আবার হুন্ডি ব্যবসা কি হালাল না তাও এখান থেকে স্পষ্ট হয়ে যাবে। হুন্ডি ব্যবসা যে কারণে অবৈধ তা হলো: –

১. আইনের লঙ্ঘন:

হুন্ডি দেশের প্রচলিত আর্থিক আইন এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করে। এটি কোনো বৈধ (ব্যাংকিং) আর্থিক চ্যানেলের  মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করে না বলে এটি রাস্ট্রিয়ভাবে অবৈধ।

২. সরকারের রাজস্ব ক্ষতি:

হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন সরকারের নজরদারির বাইরে থাকে। ফলে, এই লেনদেনের উপর কোনো প্রকার কর বা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয় না, যা রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করে।

৩. অর্থ পাচার ও অবৈধ কার্যকলাপ:

হুন্ডি প্রায়শই অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ (যেমন মাদক ব্যবসা, চোরাচালান) স্থানান্তর এবং বিদেশে পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে অপরাধমূলক কার্যকলাপ উৎসাহিত হয়।

৪. বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার:

হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ লেনদেন হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।

৫. কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই:

হুন্ডি কার্যক্রম কোনো সরকারি বা আইনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয় না। ফলে, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় না।

৬. ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন:

হুন্ডি পদ্ধতিতে অর্থ পাঠানো বা গ্রহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতারণা, অর্থ হারানোর বা সময়মতো অর্থ না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এর জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায় না।

৭. মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি:

হুন্ডি মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, যা আন্তর্জাতিকভাবেও একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

৮. আর্থিক স্থিতিশীলতার হুমকি:

একটি অনিয়ন্ত্রিত এবং অবৈধ আর্থিক ব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ।
এসব কারণেই বাংলাদেশ সরকার হুন্ডিকে একটি অবৈধ আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। শুধু বাংলাদেশই নয়; হুন্ডি যে কোনো দেশের জন্যই আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি। আর এজন্যই হুন্ডি ব্যবসা অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

About the author

eProbash

প্রবাসীদের প্রতি অকৃত্রিম হৃদয়ের টান, তাদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রেখে তাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে গর্ববোধ করি।

Leave a Comment