ভূমিকা: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এক অপরিহার্য ও শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। দেশের কোটি কোটি প্রবাসী শ্রমিক বিদেশে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে অর্থ উপার্জন করে তা বৈধ চ্যানেলে দেশে প্রেরণ করে, যা সামগ্রিকভাবে রেমিট্যান্স নামে পরিচিত।
তৈরি পোশাক শিল্পের পরেই এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা, সবকিছুতেই রেমিট্যান্সের অবদান অনস্বীকার্য, যা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি উন্নয়নশীল দেশের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরেছে।
১. সামষ্টিক অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব
রেমিট্যান্স দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে। এই রিজার্ভ আমদানির অর্থায়ন, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বা রপ্তানি আয়ে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা লাগলে রেমিট্যান্স প্রায়শই অর্থনীতির জন্য একটি স্থিতিশীল ঢাল হিসেবে কাজ করে।
মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) অবদান: জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান বর্তমানে ৬ শতাংশের বেশি। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ জাতীয় আয়কে সমৃদ্ধ করে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
লেনদেন ভারসাম্যে (Balance of Payments) উন্নতি: রেমিট্যান্স একটি দেশের বৈদেশিক আদান-প্রদানকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে, লেনদেন ভারসাম্যের ঘাটতি কমাতে সাহায্য করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
২. আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন
রেমিট্যান্সের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং গভীর প্রভাবটি পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
দারিদ্র্য হ্রাস: গবেষণায় দেখা গেছে যে রেমিট্যান্স-প্রাপ্ত পরিবারগুলোতে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রবাসীদের পাঠানো টাকা লাখ লাখ পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার ওপরের দিকে টেনে তুলেছে।
ভোগ-ব্যয় বৃদ্ধি: রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ সরাসরি পরিবারগুলোর ভোগ-ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা স্থানীয় উৎপাদন ও বাজারকে উৎসাহিত করে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন: প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা উন্নত শিক্ষা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নকে গতিশীল করে।
জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: রেমিট্যান্স-নির্ভর পরিবারগুলো পাকা বাড়ি তৈরি, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়।
৩. বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী খাত
রেমিট্যান্স শুধু ভোগ-ব্যয়েই সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সঞ্চয় এবং বিনিয়োগে রূপান্তরিত হয়।
সঞ্চয় বৃদ্ধি: রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গ্রাম ও শহর উভয় এলাকার পরিবারগুলোতে সঞ্চয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এই সঞ্চিত অর্থ পরবর্তীতে মূলধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ: অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে এসে তাদের জমাকৃত অর্থ দিয়ে ছোট ব্যবসা, কৃষি খামার বা অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেন, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
৪. চ্যালেঞ্জসমূহ ও উত্তরণের উপায়
রেমিট্যান্স দেশের জন্য আশীর্বাদ হলেও কিছু চ্যালেঞ্জ এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে সীমিত করছে:
অবৈধ চ্যানেল ‘হুন্ডি’: অবৈধ উপায়ে অর্থ প্রেরণের ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয়, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
অদক্ষ শ্রমিক: বিদেশে যাওয়া কর্মীদের একটি বড় অংশ অদক্ষ হওয়ায় তাদের আয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হয়। ফলে তাদের আয়ের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না।
বিনিয়োগের অভাব: রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে (যেমন: জমি ক্রয় বা বিলাসী পণ্য) ব্যয় হওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুণগত প্রভাব কিছুটা কমে যায়।
উত্তরণের উপায়: দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও রপ্তানিতে গুরুত্ব আরোপ, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে সরকারের প্রণোদনা বহাল রাখা এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগকে সহজ ও নিরাপদ করার জন্য বিশেষ বন্ড বা প্রকল্প চালু করা, এগুলো রেমিট্যান্সের অবদানকে আরও বাড়াতে পারে।
শেষ কথা:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান সম্পর্কে আশাকরি ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অপরিসীম। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ দেশের অর্থনীতির ‘নীরব নায়ক’ হিসেবে কাজ করছে, যা শুধু জাতীয় অর্থনীতিকেই চাঙ্গা করছে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক পরিবর্তন আনছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রেমিট্যান্সকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের সারিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। প্রবাসীদের শ্রম, ত্যাগ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকার, ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।
