রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় হলো বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্জিত অর্থ, যা তাঁরা বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে পাঠান। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই রেমিট্যান্স এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি। এটি কেবল প্রবাসীদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ থেকে শুরু করে সরকারের রাজস্ব আয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও সরকার রেমিট্যান্সের উপর সরাসরি কোনো ট্যাক্স বা শুল্ক আরোপ করে না, তবুও পরোক্ষভাবে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির মাধ্যমে এটি সরকারের আয়ের মূল ভিত্তি তৈরি করে। রেমিট্যান্স থেকে সরকারের আয় কিভাবে হয় চলুন জেনে নেওয়া যাক।
১. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি (Foreign Exchange Reserve Augmentation)
রেমিট্যান্স থেকে সরকারের আয়ের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি। রিজার্ভে -রেমিট্যান্স যে সুবিধা গুলো যোগ করে তা হলো: –
রিজার্ভে সরাসরি যোগ: যখন প্রবাসীরা ডলারে (বা অন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রায়) অর্থ দেশে পাঠান, তখন এই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক)-এর কাছে জমা হয় এবং এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যুক্ত হয়।
আমদানি ব্যয় নির্বাহ: এই রিজার্ভ ব্যবহার করে সরকার দেশের প্রয়োজনীয় আমদানির (যেমন: খাদ্য, জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল) খরচ মেটায়।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ: শক্তিশালী রিজার্ভ সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ায়, যা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করে।
বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করে রেমিট্যান্স দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকারকে বড় ধরনের স্বস্তি দেয়। এভাবেই মূলত রেমিট্যান্স থেকে সরকারের আয় হয়।
২. অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় (Increased Economic Activity and Tax Revenue)
রেমিট্যান্সের মাধ্যমে সরকারের আয়ের প্রধান পরোক্ষ পথটি হলো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বৃদ্ধি। রেমিট্যান্স থেকে সরকারের পরোক্ষ আয়ের সুবিধাগুলো হলো: –
ভোগ ও চাহিদা বৃদ্ধি: রেমিট্যান্স প্রাপক পরিবারগুলো এই অর্থ প্রধানত ভোগব্যয় (খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ে ব্যবহার করে। এর ফলে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
জিডিপি বৃদ্ধি: ভোগ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধি পায়। জিডিপি বৃদ্ধি মানেই দেশের অর্থনীতি বড় হওয়া, যার সুবিধা সরকার পায়।
রাজস্ব ও ভ্যাট সংগ্রহ: যখন রেমিট্যান্সের টাকায় কোনো পণ্য বা সেবা কেনা হয়, তখন সরকার সেই লেনদেনের উপর ভ্যাট (VAT) বা মূল্য সংযোজন কর এবং অন্যান্য শুল্ক/কর (Customs Duty/Tax) সংগ্রহ করে। যেমন, প্রবাসীর পাঠানো টাকায় টিভি বা ফ্রিজ কিনলে সরকার ভ্যাট পায়। এই ভ্যাটই সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম মূল উৎস।
৩. বিনিয়োগ ও মূলধন গঠন (Investment and Capital Formation)
রেমিট্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়, যা সরকারের আয়ের পথ আরও প্রশস্ত করে। যেমন: –
স্থায়ী সম্পদ ক্রয় ও আবাসন: প্রবাসীরা প্রায়ই রেমিট্যান্সের টাকা দিয়ে জমি ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণ করেন। এসব লেনদেনের সময় সরকারকে রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, এবং অন্যান্য কর পরিশোধ করতে হয়, যা সরকারের সরাসরি রাজস্ব।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ: অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে ছোট ব্যবসা বা শিল্পে বিনিয়োগ করেন। এসব ব্যবসার লাভ বা লেনদেনের উপর সরকার আয়কর (Income Tax) ও ভ্যাট আরোপ করে।
উপসংহার
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের সরকারের জন্য কেবল একটি আর্থিক প্রবাহ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ। যদিও রেমিট্যান্সের উপর সরকার সরাসরি কোনো আয়কর আরোপ করে না, তবুও রিজার্ভ শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে, অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে, এবং সেই বর্ধিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ও অন্যান্য কর সংগ্রহের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সরকারের রাজস্ব আয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে দেশের বাজেট ঘাটতি পূরণে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের হাতকে শক্তিশালী করেন।
