রেমিট্যান্স

রেমিট্যান্স অর্থনীতি বলতে কি বুঝায়?

রেমিট্যান্স অর্থনীতি বলতে কি বুঝায়
Written by eProbash

রেমিট্যান্স বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকেরা তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে যে অর্থ পাঠান, তা-ই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় নামে পরিচিত। যে দেশের অর্থনীতিতে এই রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ভূমিকা পালন করে, সেই অর্থনীতিকে রেমিট্যান্স অর্থনীতি বলা যেতে পারে।

অন্যান্য শ্রম-নির্ভর দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এই প্রবাসী আয় একটি অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। বহু বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে কাজ করে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবনযাত্রায়ও গভীর প্রভাব ফেলে।

রেমিট্যান্স অর্থনীতি বলতে কি বুঝায়?

রেমিট্যান্স অর্থনীতি বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামোকে বোঝায়, যেখানে বিপুল সংখ্যক নাগরিক বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যায় এবং নিয়মিতভাবে তাদের অর্জিত অর্থ নিজ দেশে প্রেরণ করে। এই অর্থ যখন দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP), বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ভোগ-ব্যয় এবং দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে, তখনই সেই দেশকে রেমিট্যান্স-নির্ভর বা রেমিট্যান্স অর্থনীতির দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সহজ কথায়, রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব বহুমুখী এবং সুদূরপ্রসারী। একে অর্থনীতির নীরব নায়ক বলা যায়। নিচে এর প্রধান প্রভাবগুলো তুলে ধরা হলো:

১. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও ভারসাম্যতা

রেমিট্যান্স হলো বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পরেই এর অবস্থান।

  • রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ: নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে, যা আন্তর্জাতিক লেনদেন, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় অত্যাবশ্যক।
  • লেনদেন ভারসাম্যে উন্নতি: প্রবাসী আয়ের কারণে দেশের লেনদেন ভারসাম্যের (Balance of Payments) ঘাটতি পূরণে সহায়তা হয়।

২. দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন

রেমিট্যান্সের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে।

  • দারিদ্র্য হ্রাস: প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গ্রামীণ এলাকার অসংখ্য পরিবারকে দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্ত করেছে।
  • ভোগ-ব্যয় বৃদ্ধি: রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আবাসন খাতে ব্যয় হয়। এর ফলে স্থানীয় বাজারে মোট চাহিদা (Aggregate Demand) এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বাড়ে।
  • সামাজিক উন্নয়ন: এই অর্থে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের ভালো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক।

৩. বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা

রেমিট্যান্সের একটি অংশ পরিবারগুলো সঞ্চয় করে এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে।

  • ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ: গ্রামীণ এলাকায় প্রবাসীদের অর্থে ছোট ব্যবসা, কৃষি সরঞ্জাম ক্রয়, এবং ঘরবাড়ি নির্মাণে বিনিয়োগ হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
  • জাতীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি: রেমিট্যান্স পরিবারগুলোর আয়ের মাত্রা বাড়ানোর মাধ্যমে জাতীয় সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধি করে।

৪. সরকারের বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা হ্রাস

রেমিট্যান্স বৈদেশিক সহায়তার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং বড় অঙ্কের অর্থ সরবরাহ করে। এর ফলে বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের ওপর দেশের নির্ভরতা অনেকটা কমে আসে।

শেষ কথা:

রেমিট্যান্স অর্থনীতি বলতে কি বুঝায় আশাকরি তা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, এটি আমাদের জাতীয় অগ্রগতির মেরুদণ্ড। প্রবাসীদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত এই অর্থ একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে, তেমনি অন্যদিকে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামগ্রিক ভোগ-ব্যয় বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

About the author

eProbash

প্রবাসীদের প্রতি অকৃত্রিম হৃদয়ের টান, তাদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রেখে তাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে গর্ববোধ করি।

Leave a Comment